শ্রীবরদী প্রতিনিধি: মোঃ শেখ সাদী সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার আশ্বিনাকান্দা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। স্ত্রী ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত। ৮ম শ্রেণীতে পড়ুয়া মেয়েটি মানসিক রোগে আক্রান্ত জন্ম থেকেই। অভাবের সংসার তার। চাকুরীর বেতন ভাতার উপর নির্ভর তার দরিদ্র পরিবার। ফসলের জমি নেই। তাই একদিন বাজার না করলে বাড়ীতে জ্বলেনা রান্নার চুলা। স্ত্রী মরণব্যাধী ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ায় তার চিকিৎসার জন্য খরচ করেছেন কয়েক লক্ষ টাকা। পারিবারিক অভাব অনটনের জন্য ২০১৭ সালে নিজ চাকুরীর বেতন বইটি সাড়ে তিন লাখ টাকায় বন্ধক রেখেছেন দাদন ব্যবসায়ী আবুল কাশেমের নিকট। টাকার বিপরীতে সুদখোর মহাজন প্রতি মাসে বেতন থেকে কেটে নেয় ১৩ হাজার টাকা। এ পর্যন্ত সাড়ে তিন লাখ টাকার বিপরীতে সুদ দিতে হয়েছে তাকে ৫ লাখ টাকার মতো। বর্তমানে পরিবারের সদস্য ৫ জন। স্ত্রীর ঔষধ কিনতেই তার অবস্থা অনেকটাই কাহিল। এর উপর আবার মানসিক ভারসাম্যহীন মেয়েটিকে নিয়ে রয়েছে চরম বিপাকে। হতাশায় বইছে তার জীবন। সুদের টাকা দিতে গিয়ে তিনি আজ সর্বশান্ত। তার মতই নির্যাতিত শিক্ষক মোঃ আনোয়ার হোসেন। তিনি উপজেলার কাউনেরচর পূর্বপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। ২০১২ সালে পারিবারিক অভাব অনটনের কারণে চাকুরীর বেতনের চেক ৫ লাখ টাকায় বন্ধক রাখেন পল্লী বিদ্যুতের লাইনম্যান মাসুদের কাছে। ৫ লাখ টাকার বিপরীতে এ পর্যন্ত সুদ দিয়েছেন ১২ লাখ টাকা। তবে আসল ৫ লাখ টাকা দিতে না পারায় দীর্ঘ দিনেও বন্ধক রাখা বইটি উদ্ধার করতে পারেনি তিনি। রোদ বৃষ্টি শত কষ্টকে মাথায় নিয়ে চাকুরী করলেও মাস শেষে পুরো বেতনের টাকা চেক দিয়ে সোনালী ব্যাংক থেকে তুলে নিতেন মাসুদ। পুরো মাস জুড়ে চাকুরী করলেও মাস শেষে খালি পকেটে ফিরে যেতে হতো তার বাড়ীতে। দরিদ্রতার সংসার অভাব অনটন তার নিত্য সঙ্গী। সহায় সম্পত্তি নেই তেমনটা। ঋণের বুঝা বইছে তার কাঁধে। মনে একটাই আশা কবে ঋণ মুক্ত হবেন। দাদন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ফিরে পাবেন বন্ধক রাখা চেক বইটি। তেমনি আরেক দরিদ্র শিক্ষক গোলাপজল হক। তিনি কাকিলাকুড়া খাসপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। এক সময় ধর্ণাঢ্য বাবার আদরের ছেলে ছিলেন। ছিল তার গোলা ভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ, ফসলের জমি ছিলনা কমতি। তার প্রয়াত পিতা আব্দুল কাদের ছিলেন এ উপজেলার একজন সুনাম ধন্য ব্যক্তিত্ব। চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তাতিহাটি ইউনিয়নে দীর্ঘদিন। পারিবারিক অভাব অনটনে আদরের দুলাল গোলাপজল এখন নিঃশ্ব। বাবদাদার ভিটে ছেড়ে থাকেন এখন শেরপুরে। ২০০০ সালে ৫ লাখ টাকায় বন্ধক রাখেন নিজ বেতনের চেক বইটি। ৫ লাখ টাকার বিপরীতে দীর্ঘ সময় জুড়ে সুদ দিয়েছেন ১৫ লক্ষ টাকার অধিক। তবে এখন সেই ৫ লাখ টাকা দিতে না পারায় জুটছে না বেতন ভাতার চেকটি। এদের মতোই আরও ৭ শিক্ষক সহ সিদ্দিকুর রহমান, আব্দুর রাজ্জাক, শাফিকুর রহমান ভেটু, আনিছুর রহমান, সুরুজ্জামান, তোজাম্মেল হক ও রেজাউল করিম সহ ১০ শিক্ষক অবশেষে শ্রীবরদী থানার ওসি রুহুল আমিন তালুকদারের সহায়তায় দীর্ঘদিন পর বন্ধক রাখা বেতনের চেক বইগুলো উদ্ধার করলো। ১০ শিক্ষকের বেতনের চেক বইগুলো উদ্ধার করে মানবতার সেবায় আবারও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন শ্রীবরদী থানার মানবিক ওসি রুহুল আমিন। গত শুক্রবার দুপুরে উদ্ধারকৃত ১০টি চেক বই ক্ষতিগ্রস্থ শিক্ষকদের হাতে তুলে দেন শেরপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) বিল্লাল হোসেন। এসময় দীর্ঘদিন বন্ধক রাখা চেক বইগুলো হাতে পেয়ে আবেগাপ্লোত হয়ে পড়েন ১০ শিক্ষক। এসময় শ্রীবরদী থানার ওসি রুহুল আমিন তালুকদার, পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) বন্দে আলী, এস.আই শফিকুর রহমান সহ অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। দীর্ঘদিন পর নিজ চাকুরী বেতনের চেক বই হাতে পেয়ে আনন্দে দিশেহারা হয়ে পড়েন শিক্ষকরা। শিক্ষক নেতা ও চেক হাতে পাওয়া শিক্ষক শাফিকুর রহমান ভেটু বলেন, আমি সাড়ে তিন লাখ টাকা নিয়ে ১৪ লাখ টাকা সুদ দিয়েছি। তবুও সুদখোরের আসল টাকা পরিশোধ হয়নি দীর্ঘদিনেও। শ্রীবরদীর মানবিক ওসি রুহুল আমিন তালুকদারের সহায়তায় বেতন ভাতার বইটি ফিরে পেয়েছি দীর্ঘদিন পর। এবার আমি নিজে চাকুরী বেতন বোনাস দিয়ে পরিবার নিয়ে ঈদ করবো বলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। এক সময়ের গোশাইপুর ইউনিয়ন আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমানে পশ্চিম বাদে ঘোনাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আমাদের উপজেলার শিক্ষকরা মুলত দরিদ্র। দরিদ্রতাকে পুজি করে দাদন ব্যবসায়ীরা শিক্ষকদের চড়া সুদে দাদনের টাকা নিতে বাধ্য করে। মাস শেষে বেতনের টাকা তুলে দিতে হয় দাদন ব্যবসায়ীদের। আমিও ৫ লাখ টাকার বিপরীতে ১৫ লক্ষ টাকা সুদ দিয়েছি। বর্তমানে ওসি সাহেবের সহায়তায় বন্ধক রাখা বইটি ফিরে পেয়েছি। তাই জেলা পুলিশকে ধন্যবাদ জানাই। স্থানীয় সমাজ সেবক ও শ্রীবরদী শহর আ’লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জিয়াউর রহমান মানিক বলেন, ওসি রুহুল আমিন মানবতার কল্যাণে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। শ্রীবরদীকে অপরাধমুক্ত গড়ার লক্ষ্যে তার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। শ্রীবরদীর সার্বিক আইন শৃঙ্খলার উন্নয়নে ওসি রুহুল আমিনের বিকল্প নেই। এ প্রসঙ্গে ওসি রুহুল আমিন তালুকদার বলেন, শ্রীবরদীর সুদখোরদের পাতানো ফাঁদে পড়ে অনেক শিক্ষক আজ নিঃশ্ব। চড়া সুদের টাকা দিতে গিয়ে ঘড়বাড়ী, সহায় সম্পত্তি বিক্রি করেও টাকা পরিশোধ করতে পারছে না তারা। দাদন ব্যবসায়ীদের ঋণের জাল থেকে মুক্ত হতে পারছে না তারা। আমাদের শেরপুরের পুলিশ সুপার কাজী আশরাফুল আজিমের নির্দেশনায় আমরা ইতিমধ্যে ওই ১০ শিক্ষকের কাছ থেকে লিখিত অভিযোগ নিয়ে দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তাদের বন্ধক রাখা বইগুলো উদ্ধার করে দিয়েছি। দাদন ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। দাদন ব্যবসায়ীরা যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, তাদের ছাড় দেওয়া হবে না। দাদন ব্যবসায়ীরা মুলত সমাজের ঘৃণ্ন ব্যক্তি। তাদের সামাজিক ভাবে বয়কট করা দরকার। শেরপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) বিল্লাল হোসেন ১০ শিক্ষকের সুন্দর ও সুখী জীবনের প্রত্যাশ্যা নিয়ে বলেন, নির্যাতিত নিপীড়িত শিক্ষকদের পাশে পুলিশ আছে থাকবে। তাদের যে কোন সমস্যায় পুলিশ তাদের সহায়তা করবে। তাদের উপর দাদন ব্যবসায়ীদের কোন ধরনের নির্যাতন ও অত্যাচার চালালে দাদন ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মামলা নেওয়া হবে।